ট্রেডিং শুরু করার কিছুদিন পর অনেকেই একটা অদ্ভুত জায়গায় এসে দাঁড়ান। কোনো দিন বেশ ভালো লাভ হয়। মনে হয়, হ্যাঁ এবার বোধহয় বিষয়টা ধরে ফেলেছি, তারপর কয়েকটা ভুল ট্রেড। আগের লাভের বড় একটা অংশ চলে যায়। শুরু হয় নতুন স্ট্র্যাটেজি খোঁজা। চার্টে যোগ হয় নতুন ইন্ডিকেটর। ইউটিউবে আবার নতুন সেটআপের সন্ধান। কিছুদিন পর সেটাও বাদ দিয়ে আরেকটা।
এভাবে মাসের পর মাস কেটে যায়, চার্ট বদলায়, স্ট্র্যাটেজি বদলায়, ইন্ডিকেটর বদলায়। শুধু একটা জিনিসই ঠিকমতো তৈরি হয় না, নিজের ট্রেডিং প্রক্রিয়া।
মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় সমস্যাটা এই নয় যে একজন ট্রেডার মার্কেট সম্পর্কে কিছুই জানেন না। বরং তিনি হয়তো অনেক কিছুই জানেন। সমস্যা হলো, কখন কী করবেন, কেন করবেন এবং ভুল হলে কী করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা এখনো গোছানো হয়নি।
ট্রেডিংয়ে কিছু জানা আর ধারাবাহিকভাবে করতে পারা এক বিষয় নয়, সাপোর্ট রেজিস্ট্যান্স শেখা যায়, ট্রেন্ডলাইন শেখা যায়, মুভিং এভারেজ, ক্যান্ডেলস্টিক প্যাটার্ন কিংবা বিভিন্ন ইন্ডিকেটরও শেখা যায়, কিন্তু মার্কেটের সামনে আসল পরীক্ষা শুরু হয়।
কোন পরিস্থিতিতে ট্রেড নেবেন, কোন পরিস্থিতিতে সুন্দর সেটআপ দেখেও ট্রেড নেবেন না, কোথায় বুঝবেন আপনার ধারণা ভুল ছিল, কতটুকু ঝুঁকি নেবেন, আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, একই নিয়ম কি আপনি বারবার অনুসরণ করতে পারবেন?
থিওরেটিক্যাল নলেজ আপনাকে কী করতে হবে তা শেখায়, দক্ষতা তৈরি হয় যখন আপনি সেটি প্রাকটিক্যালি ব্যাবহার করতে পারবেন। গাড়ি চালানোর নিয়ম বই পড়ে শেখা সম্ভব, কিন্তু বই শেষ করে কেউ হাইওয়েতে দক্ষ চালক হয়ে যায় না, তাকে গাড়ি চালাতে হয়, ভুল করতে হয়, ভুল বুঝতে হয়, তারপর ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়।
ট্রেডিংও অনেকটা তেমন, নতুন ট্রেডাররা সাধারণত কোথায় আটকে যান?
প্রথম সমস্যা হলো, নির্দিষ্ট ট্রেডিং প্রক্রিয়ার অভাব, আজ একটি সেটআপ, কাল আরেকটি, আজ একজনের নিয়ম, আগামী সপ্তাহে আরেকজনের নিয়ম, ফলে কিছুদিন পর বোঝাই কঠিন হয়ে যায়, আসলে স্ট্র্যাটেজি কাজ করছে না, নাকি ট্রেডার নিজেই কোনো নিয়ম যথেষ্ট সময় ধরে অনুসরণ করেননি।
দ্বিতীয় সমস্যা, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অনেকেই স্ট্র্যাটেজির পরে রাখেন, অথচ ভুল ট্রেড হওয়া ট্রেডিংয়ের অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, এটাই স্বাভাবিক, আপনি পৃথিবীর সেরা এনালাইসিস করেও ভুল হতে পারেন, তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুধু “এই ট্রেডে কত লাভ হতে পারে” নয়, আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, “আমি ভুল হলে কতটুকু হারাতে প্রস্তুত?”
তৃতীয় সমস্যা আসে যখন সত্যিকারের মানি ইনভলভ হয়, চার্ট তখন আর শুধু চার্ট থাকে না, প্রফিট দেখলে দ্রুত বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। লস হলে মনে হয় আরেকটু অপেক্ষা করি, একটা ট্রেড মিস হলে সেটার পেছনে দৌড়াতে ইচ্ছে করে, ক্ষতির পর মনে হয় পরের ট্রেডেই টাকাটা ফেরত আনতে হবে, এই জায়গায় আরেকটা ইন্ডিকেটর খুব বেশি সাহায্য করে না, কারণ সমস্যাটা তখন চার্টে নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায়।
আরও একটি বড় সমস্যা আছে, নিজের ভুল নিজে সবসময় দেখা যায় না, একজন ট্রেডার হয়তো ভাবছেন তার স্ট্র্যাটেজি খারাপ, অথচ সমস্যাটা স্ট্র্যাটেজিতে নয়, সমস্যা হতে পারে ভুল এন্ট্রি বাছাইয়ে, অতিরিক্ত ঝুঁকিতে, নিয়ম না মানায় কিংবা ট্রেড পরিচালনার পদ্ধতিতে।
এই পার্থক্যটা যত দ্রুত ধরা যায়, শেখার পথ তত পরিষ্কার হয়। তাহলে একজন নতুন ট্রেডারের আসলে কী প্রয়োজন? আরও দশটা ইন্ডিকেটর? আরও বিশটা সেটআপ? আরও একশোটা ইউটিউব ভিডিও? সবসময় নয়।
অনেক সময় প্রয়োজন একটি গোছানো শেখার প্রক্রিয়া, যেখানে প্রথমে ভিত্তি পরিষ্কার হবে। তারপর চার্ট পড়া শেখা হবে, একটি সেটআপ কেন কাজ করতে পারে তার যুক্তি বোঝা হবে, রিস্ক ম্যানেজমেন্টের নিয়ম থাকবে, রিয়েল চার্টে প্রাকটিস হবে, নিজের ট্রেড এনালাইসিস করা হবে, ভুলগুলো চিহ্নিত করে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তৈরি হবে।
কারণ ট্রেডিংয়ের উদ্দেশ্য এমন কোনো জাদুকরী স্ট্র্যাটেজি খুঁজে বের করা নয়, যেটি প্রতিটি ট্রেডে লাভ দেবে, এমন স্ট্র্যাটেজির সন্ধানে অনেকেই বছরের পর বছর কাটিয়ে দেন।
ভালো ট্রেডার ভবিষ্যৎ জানেন না। তিনি শুধু আগে থেকেই জানেন, ঠিক হলে কী করবেন আর ভুল হলে কী করবেন, এই জায়গাটাই গুরুত্বপূর্ণ, আপনার এমন একটি রিপিটেবল স্ট্রাটেজি প্রয়োজন, যেখানে আপনি জানেন কেন ট্রেড নিচ্ছেন, কতটুকু রিস্ক নিচ্ছেন, কোথায় আপনার প্রেডিকশন ভুল প্রমাণিত হবে এবং এরপর কী করবেন।