ব্যস, ইন্টারনেটের হাতে আর কী লাগে! অনেকে মজা করে বলছেন, “নিজের ঘাড়ে বিলিয়ন ডলারের ঋণ, আবার মানুষকে শেখায় কীভাবে ধনী হতে হয়!”
কথাটা শুনতে বেশ মজার, সমস্যা একটাই অর্ধেক তথ্য দিয়ে বানানো কৌতুক অনেক সময় পুরো ঘটনাটাকেই অন্যভাবে দেখায়, প্রথমে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার, অর্থনৈতিক মোটিভেশনাল বই রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড এর লেখক রবার্ট কিয়োসাকি নিজেই তাঁর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ঋণে জড়িত থাকার কথা বলেছেন। কিন্তু এত বড় অঙ্কের ঋণের কথা শুনেই যদি আপনার মনে হয়, লোকটা ধার করে সব টাকা খরচ করে এখন পাওনাদারের ভয়ে ফোন বন্ধ করে বসে আছে, তাহলে ছবিটা ঠিক এমন নয়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই ঋণের বড় একটা অংশ বিভিন্ন সম্পদ ও রিয়েল এস্টেট ইনেস্টমেন্টের সঙ্গে জড়িত। অর্থাৎ শুধু ঋণের অঙ্কটা দেখলে পুরো চিত্রটা বোঝা যায় না। এর বিপরীতে কী পরিমাণ এসেট আছে, সেগুলো থেকে কত আয় হচ্ছে এবং মোট ঋণের তুলনায় তার আর্থিক অবস্থান কী, সেটাও দেখতে হবে।
একটা সহজ উদাহরণ দিই, ধরুন, একজন মানুষের ওপর ৮ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক দেনা আছে। পরদিন আমি ফেসবুকে লিখলাম, “সর্বনাশ! এই লোকের ৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ! আবার নিজেকে ইনভেস্টর বলে!”
পোস্ট ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু পরে জানা গেল, সেই ঋণের বিপরীতে তার হিউজ আয় করা সম্পদও রয়েছে। তখন গল্পটা একটু বদলে গেল, তাই না?
কারণ কারও আর্থিক অবস্থা বোঝার জন্য শুধু তার ঋণের অঙ্ক দেখলে হবে না। সেই ঋণের বিপরীতে কী সম্পদ আছে, সম্পদ থেকে কী পরিমাণ আয় হচ্ছে এবং মোট ঋণের তুলনায় তার আর্থিক অবস্থান কেমন সেটাও দেখতে হবে।
এখানে অবশ্য একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। রবার্ট কিয়োসাকির আর্থিক চিন্তাধারায় ধার করা টাকা ব্যবহার করে সম্পদ তৈরি করার ধারণাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সব ধরনের অর্থায়ন গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে সুদভিত্তিক ঋণ ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই কোনো ব্যক্তি সুদভিত্তিক ঋণ ব্যবহার করে লাভজনক সম্পদ তৈরি করছেন, এটা ব্যাখ্যা করা এক বিষয়, আর সেই পদ্ধতিকে ইসলামীভাবে বৈধ বা অনুসরণযোগ্য বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
কোনো কৌশল অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে, কিন্তু লাভজনক হলেই সেটা হালাল হয়ে যায় না, এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই আলোচনা রবার্ট কিয়োসাকির ঋণ নেওয়ার পদ্ধতিকে সমর্থন করার জন্য নয়, আলোচনার বিষয় শুধু এতটুকু যে কারও বিশাল ঋণের অঙ্ক দেখেই তার পুরো আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
আবার বড় ঋণ মানেই যে বুদ্ধিমান বিনিয়োগ, সেটাও নয়, ঋণের বিপরীতে থাকা সম্পদ যদি প্রত্যাশামতো আয় না করে, সম্পত্তির দাম কমে যায়, কিংবা অন্যান্য খরচ বেড়ে যায়, তাহলে বড় আর্থিক দেনা খুব সহজেই বড় রিস্কে পরিণত হতে পারে, তাই কারও ঋণের অঙ্ক শুনেই তাকে গরিব ভাবা যেমন ভুল, তেমনি বড় ঋণ দেখেই তাকে আর্থিক প্রতিভাবান ভাবাও ভুল।
আসল প্রশ্ন হলো, ঋণটা কেন নেওয়া হয়েছে, এর বিপরীতে তার কী পরিমান সম্পদ রয়েছে, সেই সম্পদ কতটা প্রফিট জেনারেট করতে পারছে। আর একজন মুসলিমের জন্য আরও একটা প্রশ্ন আছে, উক্ত পদ্ধতিটা শরিয়াহসম্মত কি না।
কারণ একজন মানুষের আর্থিক অবস্থার পুরো গল্প শুধু তার ঋণ ই বলে না, গল্পের আরেকটা অংশ লেখা থাকে তার সম্পদ আর দেনার মদ্ধে পার্থক্য কতটা। আর একজন মুসলিমের জন্য গল্পটা সেখানেও শেষ নয়। লাভ কত হলো, তার আগে দেখতে হবে লাভের পথটা হালাল ছিল কি না, কারণ সম্পদ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু বরকত হারিয়ে সম্পদ বাড়ানো কখনোই আমাদের লক্ষ্য হতে পারে না।